উমরাহঃ হিল (হারামের সীমানার বাইরে মিকাতের ভেতরের স্থান) থেকে অথবা মিকাত থেকে ইহরাম বেঁধে বায়তুল্লাহ শরিফ তাওয়াফ করা, তাওয়াফের দুই রাকাত নামাজ পড়া, জমজম শরীফ পান করা, সাফা-মারওয়া সাঈ করা এবং মাথার চুল ফেলে দেওয়া বা ছোট করা । এই কাজ গুলো ধারাবাহিকভাবে করাকে উমরাহ বলে।

উমরাহ করার নিয়ম

১. উমরার ইহরাম (ফরজ)

  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সেরে গোসল বা অজু করে নিন।
  • মিকাত অতিক্রমের আগেই সেলাইবিহীন একটি সাদা কাপড় পরিধান করুন, আরেকটি গায়ে জড়িয়ে নিয়ে নিন। এর পর টুপি পরে বা গায়ের চাদর দ্বারা মাথা ঢেকে (টুপি বা চাদর উমরাহ বা হজ্জ এর নিয়ত করার আগে নিয়ে ফেলবে । কারণ ইহরাম বেঁধে পেললে মস্তক ঢাকা নিষিদ্ধ) ইহরামের নিয়তে দু‘রাকাআত সুন্নাত নামাজ (১ম রাকাতে সুরা ফাতেহার সাথে সুরা কাফেরুন এবং ২য় রাকাতে সুরা ফাতেহার সাথে সুরা এখলাস পাঠ করা) আদায় করবে ৷ মাকরূহ ওয়াক্ত হলে নামাজের জন্য অপেক্ষা করবে৷
  • বাংলায় নিয়তঃ ইহরামের দুরাকাত সুন্নাত নামাজ আদায় করার উদ্দেশ্যে নিয়্যত করলাম, আল্লাহু আকবার।
  • উমরাহর নিয়ত করে এক বা তিনবার তালবিয়া পড়ে নিন। পুরুষরা উচ্চঃস্বরে আর মহিলারা নিম্নস্বরে তালবিয়াহ্‌ পাঠ করবে।
  • উমরাহর নিয়তঃ আল্লাহুম্মা ইন্নি উরীদুল উমরাতা ফাইয়াছ ছিরহালী ওয়া তাকাব্বালহা মিন্নি।
    অর্থঃ- হে আল্লাহ আমি উমরাহ পালনের নিয়ত করছি। তা আমার জন্য সহজ করে দিন এবং কবুল করে নিন। অথবা-
    লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা উমরাতান। (হে আল্লাহ! আমি হাজির, উমরাহ পালনের জন্য)
  • তালবিয়া হলোঃ লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্‌দা, ওয়াননি’মাতা লাকাওয়াল মুলক, লা শারিকালাক ।
  • কাবা শরিফে প্রবেশ (‘বাবুস সালাম’ দরজা দিয়ে প্রশে করা মুস্তাহাব) করার সময় ‘বিসমিল্লাহি, ওয়াস সালাতু ওয়াসালামু আলা রাসুলিল্লাহি, আল্লাহুম্মাফ তাহলি আবওয়াবা রাহমাতিকা’ পড়বেন।

২. উমরার তাওয়াফ (ফরজ)

  • অজুর সঙ্গে ইজতিবাসহ তাওয়াফ করুন। ইহরামের চাদরকে ডান বগলের নিচের দিক থেকে পেঁচিয়ে এনে বাঁম কাঁধের ওপর রাখাকে ইজতিবা বলে।
  • হাজরে আসওয়াদকে সামনে রেখে তার বরাবর ডান পাশে দাঁড়ান (২০০৬ সাল থেকে মেঝেতে সাদা মার্বেল পাথর আর ডান পাশে সবুজ বাতি)। তারপর দাঁড়িয়ে তাওয়াফের নিয়ত করুন।
  • তাওয়াফের নিয়ত (কালরেখার উপর দাঁড়িয়ে): আল্লাহুম্মা ইন্নি উরীদু তাওয়াফা বাইতিকাল হারামী ছব’আতা আশোয়াতিনলিল্লহি তা’য়ালা ফাইছছিরহুলী ওয়া তাকাব্বালহু মিন্নী।
    অর্থঃ- হে আল্লাহ আমি তুমার বায়তুল হারামকে সাত চক্ষরে তোয়াফ করার ইচ্ছা করছি একমাত্র তুমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য। আমার জন্য তা সহজ করে দিন।এবং কবুল করে নিন।
  • তারপর ডানে গিয়ে এমনভাবে দাঁড়াবেন, যেন হাজরে আসওয়াদ পুরোপুরি আপনার সামনে থাকে। এরপর নামাজের নিয়ত বাঁধার মতো করে উভয় হাত কাঁধ পর্যন্ত তুলে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর’ পড়ুন। পরে হাত ছেড়ে দিন এবং হাজরে আসওয়াদের দিকে দুই হাত বা ডান হাত দিয়ে ইশারা করে হাতের তালুতে চুমু খেয়ে ডান দিকে চলতে থাকুন, যাতে পবিত্র কাবাঘর পূর্ণ বাঁয়ে থাকে। পুরুষের জন্য প্রথম তিন চক্করে রমল করা সুন্নত । রমল অর্থ বীরের মতো বুক ফুলিয়ে কাঁধ দুলিয়ে ঘন ঘন কদম রেখে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলা।
  • রুকনে ইয়ামানিকে সম্ভব হলে শুধু ডান হাতে স্পর্শ করুন। চুমু খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। সম্ভব না হলে এর প্রয়োজন নেই, ইশারা করার জন্য হাত উঠাতে হবে না । রুকনে ইয়ামানিতে এলে ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আযাবান্নার’ বলুন। অতঃপর হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত এসে চক্কর পুরো করুন।
  • পুনরায় হাজরে আসওয়াদ বরাবর দাঁড়িয়ে বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে দুই হাত বা ডান হাত দিয়ে হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করে হাতের তালুতে চুমু খেয়ে দ্বিতীয় চক্কর শুরু করুন। এভাবে সাত চক্করে তাওয়াফ শেষ করুন। সাত চক্কর শেষে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করে সম্ভব না হলে হাত দিয়ে ইশারা করে হাতের তালুতে চুমু খেয়ে তাওয়াফ শেষ করুন ।
  • হাতে সাত দানার তসবি অথবা গণনাযন্ত্র রাখতে পারেন । তাহলে সাত চক্কর ভুল হবে না। প্রত্যেক তাওয়াফে চক্কর সাত এবং ইসতিলাম (হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়া বা হাত দিয়ে ইশারা করা) ৮ বার হবে । সাত চক্করে তাওয়াফ শেষ করার পর ডান কাধ ঢেকে নিন।

৩. তাওয়াফের দুই রাকাত নামাজ (ওয়াজিব)

মাকামে ইবরাহিমের পেছনে বা হারামের যেকোনো স্থানে তাওয়াফের নিয়তে (মাকরুহ সময় ছাড়া) দুই রাকাত নামাজ পড়ে দোয়া করুন। নামাজের ১ম রাকাতে সুরা ফাতেহার সাথে সুরা কাফেরুন এবং ২য় রাকাতে সুরা ফাতেহার সাথে সুরা এখলাস পাঠ করা মুস্তাহাব। তবে সুরা ফাতেহার সাথে অন্য যে কোন সুরা মিলিয়ে উভয় রাকাতে সালাত আদায় করা যাবে। এ নামাজ মাকামে ইব্রাহীমের যত নিকটে পড়া যায় ততই উত্তম। মসজিদুল হারামের ভেতরে যে কোন স্থানে এ নামাজ আদায় করা যাবে। নামাজ শেষে সেখানে বসে বা দাড়িয়ে বা সুবিধামত স্থানে দোয়া পড়া ও মুনাজাত করা যাবে। এটা দোয়া কবুলের সময়।

নিয়তঃ নাওয়াইতুয়ান উসাল্লিয়া লিল্লাহি তা’আলা রাকাতায় ছালাতিল ওয়াজিবুত তাওয়াফ মোতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারীফাতি আল্লাহু আকবার।

বাংলায় নিয়তঃ হে আল্লাহ্‌, আমি দু-রাকাত  ওয়াজিবুত তাওয়াফ নামাজ আদায় করার উদ্দেশ্যে নিয়ত করিলাম আল্লাহু আকবার ।

নামাজ পড়ার পর ক্বিবলাকে সামনে রেখে জমজম শরীফ পান করুন আর দোয়া করুন। মনে রাখবেন, এটাও দোয়া কবুলের সময়।

৪. উমরাহর সাঈ (ওয়াজিব)

সাফা পাহাড়ের কিছুটা ওপরে উঠে (এখন আর পাহাড় নেই, মেঝেতে মার্বেল পাথর, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত) কাবা শরিফের দিকে মুখ করে সাঈ-এর নিয়ত করে (নিয়তঃ ‘হে আল্লাহ্ আমি তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সাত চক্করে সাঈ করার ইচ্ছা করছি; এটা আমার জন্য সহজ করো ও কবুল করো।’ অন্তরে এ নিয়ত করা যথেষ্ট, তবে মুখে উচ্চারণ করা উত্তম।), এরপরে সম্ভব হলে সায়ীর কুরআনী দোয়া পড়ুন।

সায়ীর কুরআনী দোয়াঃ

ইন্নাছ্ ছাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন্ শাআ’ইরিল্লাহ্ ফামান হাজ্জাল বাইতা আও-ই’ তামারা ফালা জুনাহা আ’লাইহি আইয়াত্ত্বাওয়াফা বিহিমা ওমান তাত্বাওয়াআ খাইরান ফা-ইন্নাল্লাহা শাকিরুণ আ’লীম।

তারপর দোয়ার মতো করে হাত তুলে তিনবার তাকবীর ও তাহলীল (আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু) বলে কাকুতি মিনতিসহ দোয়া করুন। তারপর মারওয়ার দিকে রওনা হয়ে দুই সবুজ দাগের মধ্যে (এটা সেই জায়গা, যেখানে হজরত হাজেরা (রা·) পানির জন্য দৌড়েছিলেন) একটু দ্রুত পথ চলে মারওয়ায় পৌঁছালে এক চক্কর পূর্ণ হলো। এই দুই সবুজ বাতির মাঝে দ্রুতগতিতে চলতে থাকতে হবে (মহিলাদের জন্য প্রযোজ্য নয়) এবং এই দো’আ পড়তে হবে- ‘রাব্বিগফির ওয়ারহাম ওয়া আনতাল আ’আজ্জুল আকরাম’। সাঈ’র জন্য কোন দো’আ নির্দিষ্ট নেই। তারপর মারওয়া পাহাড়ে উঠে কাবা শরিফের দিকে মুখ করে দোয়ার মতো করে হাত তুলে তিনবার তাকবির ও তাহলীল বলে দোয়া করুন এবং আগের মতো চলে সেখান থেকে সাফায় পৌঁছালে দ্বিতীয় চক্কর পূর্ণ হলো এভাবে সপ্তম চক্করে মারওয়ায় গিয়ে সাঈ শেষ করে দোয়া করুন। সাঈ-এর নিয়ত ও সায়ীর কুরআনী দোয়া শুধু সাঈ শুরু করার সময় প্রথম একবারই করবে । তাকবির ও তাহলীল আর দোয়া প্রত্যেকবার করবে।

৫. হলক করা (ওয়াজিব)

পুরুষ হলে রাসুলুল্লাহ (সা·)-এর আদর্শের অনুসরণে সম্পূর্ণ মাথা মুণ্ডন করবেন, তবে মাথার চুল ছাঁটতেও পারেন। মহিলা হলে চুলের মাথা এক ইঞ্চি পরিমাণ কাটবেন।

যিয়ারাতে মদীনাহ

হজ্জের পূর্বে অথবা পরে (সুবিধামত) সময়ে হাজীদল তথা প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা (দঃ) এর পাগলপাড়া উম্মতগণ এক মূহুর্তে একদিন/তথা ৮ দিনের জন্য (সম্ভব হলে) নতুবা এক রাত হলেও মদীনা শরীফে যান এবং রাসূলে পাক (দঃ) এর রওজা মোবারক যিয়ারত, রিয়াদুল জান্নাতে বসা (নামাজ আদায় করা) জান্নাতুল বাকী যিয়ারত করা এবং বিশেষতঃ ৮ দিনে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় করাসহ বহু ঐতিহাসিক
স্থান তথা উহুদ পাহাড় ও বদর প্রান্তর দেখার সৌভাগ্য অর্জন করে থাকেন। এছাড়া মদীনা শরীফে আর কোন কাজ নেই। মূলতঃ মদীনা শরীফে মাসজিদে নববীতে নামাজ ও রাসূলের পাক (দঃ) এর রওজা শরীফ যিয়ারতই হল প্রধান কাজ।

মসজিদে নববীতে নামাজ পড়ার সওয়াব অত্যন্ত বেশী৷ এক নামাজের সওয়াব পঞ্চাশ হাজার নামাজের সমান৷ যদি সম্ভব হয় বা সময় সূযোগ থাকে তাহলে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ (সুন্নাত) রয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, ৮দিন=৪০ ওয়াক্ত থাকতেই হবে। এটা ফরজ বা ওয়াজিব নয়। আসলে এটা সুন্নাত এবং হজ্জের অংশ নয়। মূলতঃ আশেকে রাসূল (দঃ) দের জন্য রাসূলে পাক (দঃ) এর রওজা মোবারক যিয়ারতের নিয়্যাতে যাওয়াই হল মূল।

এছাড়া পবিত্র হাদীস গ্রন্থে রওযা মুবারক যিয়ারতের ফযীলত সম্পর্কে অসংখ্য উৎসাহ করা হয়েছে । যেমন- এক হাদীসে নবী (সাঃ) ইরশাদ করেন, আমার উম্মতের মধ্যে যে কোন লোক আমার ইন্তেকালের পর আমার রওযা যিয়ারত করবে, সে যেন আমায় জীবিত অবস্থায় দেখল ।

অন্য এক হাদীসে মহানবী (সাঃ) ইরশাদ করেন, যে কোন লোক একমাত্র আমার রওযা যিয়ারতের উদ্দেশ্যেই মদীনা শরীফে আগমন করে এছাড়া কোন দুনিয়াবী উদ্দেশ্য তার নেই, তাহলে আল্লাহর দরবারে তার এ অধিকার জন্মায় যে, তিন আমাকে তার সুপারিশকারী বানাবেন । অর্থাৎ আমি তার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে অবশ্যই সুপারিশ করতে বাধ্য হব । তিনি আরও বলেন, যে হজ করল কিন্তু আমার রওজা জিয়ারত করল না; সে আমার প্রতি জুলুম করল। (ইবনু হিব্বান, দারু কুতনী, দায়লামি) ফকিহগণের মতে, হাজীর জন্য মদিনা শরিফ জিয়ারত করা সুন্নত।

এছাড়া ইসলামে ফজিলত লাভের উদ্দেশ্যে তিন মসজিদে ভ্রমণ করার অনুমোদন আছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো মক্কা মুকাররমা বা কাবা শরিফ (সৌদি আরব)। দ্বিতীয়টি হছে মসজিদ আল-আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাস : ইসলামের প্রথম কিবলা মসজিদ (ফিলিস্তিন)। তৃতীয়টি হলো মদিনা আল-মুনাউয়ারার মসজিদে নববী : নবীজ্বিকে যেখানে চিরশয়নে শায়িত করা হয়েছে ৷ মদিনা নবীর শহর, একে আরবিতে বলা হয় ‘মদিনাতুন নবী’ । আর মদিনার প্রাণকেন্দ্র হলো ‘মমজিদে নববী’ । মদিনার ৯৫টি নাম রয়েছে যেমন দারুসসালাম (শান্তির ঘর) । এ ছাড়া মদিনার ৯৯টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনার বরকতের জন্য দোয়া করেছেন, একে হারাম বা সম্মানিত ঘোষণা করেছেন।

হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, ঘর থেকে অজু করে মসজিদে কুবায় গিয়ে নামাজ পড়লে একটি উমরাহর সওয়াব পাওয়া যায় ৷ মসজিদে নববীর ভেতরে স্বয়ংক্রিয় ছাদের ব্যবস্থা আছে, যা দিনের বেলা সুইচের মাধ্যমে খুলে দেওয়া হয় আর রাতে বন্ধ করে দেওয়া হয় ৷ মসজিদে নববীতে নারীদের জন্য নামাজ পড়ার আলাদা জায়গা আছে। ভেতরে কিছুদূর পর পর পবিত্র কোরআন মজিদ রাখা আছে, আর পাশে আছে জ্বমজমের পানি খাওয়ার ব্যবস্থা। পাশেই ‘জান্নাতুল বাকি’ কবরস্থান। এখানে হজরত ফাতেমা (রা.), হজরত ওসমান (রা.) সহ অগণিত সাহাবায়ে কিরামের কবর রয়েছে। এর একপাশে নতুন কবর হচ্ছে প্রত্যহ। এখানে শুধু একটি পাথরের খণ্ড দিয়ে চিহ্নিত করা আছে একেকটি কবর । কেউ কেউ একে ‘বাকি’ কবরন্থান বলে সম্বোধন করেন। মসজিদে নববীর উত্তর দিকের গেট দিয়ে বেরিয়েই সাহাবাদের মসজিদ । পাশাপাশি দুটি এবং একটু দূরে একটি একই আকৃতিতে করা তিনটি মসজিদ। এগুলোকে ‘সাহাবা মসজিদ’ বলা হয়।

মসজিদে নববীতে সালাত আদায় ও দোয়া করার উদ্দেশ্যেই মদিনায় যাওয়া । সালাত আদায় করে রাসূলূল্লাহ (সা.) এর রওজা শরিফ জিয়ারত করা এবং সালাম পৌছানাের ইচ্ছা প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের থাকে ৷ জিয়ারত ও নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যেই মদিনায় যাওয়া সুন্নাত। মসজিদে নববীতে নামাজ পড়ায় ফজিলত বেশি।

মদীনা শরীফ যাওয়ার পথে যত বেশী সম্ভব নবী (সাঃ) এর গুণ-গান সম্বলিত দরূদসমূহ এবং সালাম পাঠ করা কর্তব্য । এছাড়া যখন মদীনার দেয়াল দেখা যাবে তখন অবশ্যই দরূদ এবং সালাম পাঠ করবে । এরপর শহরে প্রবেশ করার আগে উত্তমরূপে গোসল করবে ও খুশবু ব্যবহার করবে আর সাদা কাপড় পরিধান করে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে নিন্মের দোয়াটি পাঠ করতে থাকবে ।

উচ্চারণঃ রাব্বি আদখিলনি মুদখালা ছিদক্বিওঁ ওয়া আখরিজনী মুখরাজা ছিদক্বিওঁ ওয়াজ্ আল্লী মিল্লা দুনকা সুলত্বানান নাছীরা ।

অর্থঃ হে আল্লাহ্! তুমি আমাকে সততা অর্জনের স্থানে প্রবেশ করাও এবং সততার সাথে বাইরে আসতে সাহায্য কর এবং তোমার করুণা দ্বারা তুমি আমাদের জন্য সাহায্য দানকারী প্রেরণ কর ।

এরপর মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে মিম্বরের নিচে দাঁড়িয়ে এভাবে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করবে যেন মিম্বরের খাম বা খুঁটি নিজের ডান কাঁধ বরাবর থাকে । কেননা ঐ স্থানে দাঁড়িয়ে নবী কারীম (সাঃ) সর্বদা নামাজ আদায় করতেন । এরপর রওযা মুবারক যিয়ারতের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রওযা মুবারকের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আদবের সাথে দরূদ শরীফ ও সালাম পাঠ করে প্রাণভরে দোয়া করবে । পবিত্র রওযা মুবারক যিয়ারত শেষ করে কিছুদূর সামনে এগিয়ে হযরত আবু বক্কর সিদ্দিক (রাঃ) ও হযরত ওমর (রাঃ) এর রওযা মুবারক যিয়ারত করবে এবং প্রাণভরে দোয়া-মুনাজাত করে সেখান হতে জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে সেখানে শায়িত সাহাবীগণের কবর যিয়ারত শেষে আবার রওযা মুবারকে এসে প্রাণভরে দরূদ ও সালাম পাঠ করে সেখান হতে বিদায় নেবে ।

নবী করিম (সা.) এর রওজা মোবারক : সালাম পেশ করার নিয়ম
কিবলার দিকে পিঠ করে নবী করিম (সা.) এর চেহারা মোবারক সামনে রেখে এমনভাবে দাঁড়াতে হবে, যেন রাসূলুল্লাহ (সা.) আপনার সামনে। এ সময় পৃথিবীর যাবতীয় চিন্তভাবনা থেকে মনকে মুক্ত করে একাগ্র চিত্তে অত্যন্ত আদবের সঙ্গে সালাম পেশ করতে হবে। এ রকম খেয়াল করতে হবে যে নবী করিম (সা.) কবর মোবারকে কিবলার দিকে মুখ করে আরাম করছেন এবং সালাম-কালাম শ্রবণ করছেন।

সালাম পাঠ করুনঃ
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সম্মান ও মর্যাদার কথা স্মরণ করে মধ্যম আওয়াজে সালাম পেশ করতে হবে। সালাম এভাবে পাঠ করুন-

আস-সালাতু আস-সালামু আলাইকা ইয়া রসুলুল্লাহ
আস-সালাতু আস-সালামু আলাইকা ইয়া হাবীবাল্লাহ
আস-সালাতু আস-সালামু আলাইকা ইয়া রাহমাতাল্লির আলামীন

তারপর ডান দিকে সরে গিয়ে হজরত আবু বক্কর (রা.)-এর চেহারা মোবারক বরাবর দাড়িয়ে পাঠ করুন-
আসসালামু আলাইকা ইয়া খালিফাতি রাসূলুল্লাহি আবু বক্কর (রা.)।

তারপর ডান দিকে সরে গিয়ে হজরত উমর (রা.)- এর চেহারা মোবারক বরাবর দাঁড়িয়ে পাঠ করুন-
আসসালামু আলাইকা ইয়া আমীরাল মু’মিনীন উমর ফারুক (রা.)।

কয়েকটি বিশিষ্ট স্থানের পরিচয়

মাতাফ: কাবাঘরের চারদিকে অবস্থিত তওয়াফের স্থানকে ‘মাতাফ’ বা চত্বর বলা হয়।

হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর: হাজরে আসওয়াদ কাবা শরিফের দক্ষিণ-পূর্বকোণে মাতাফ (তাওয়াফের জায়গা) থেকে দেড় মিটার ওপরে লাগানো। হাজরে আসওয়াদ তাওয়াফ (কাবা শরিফ সাতবার চক্কর দেওয়া) শুরুর স্থান। প্রতিবার চক্কর দেওয়ার সময় এই হাজরে আসওয়াদে চুমু দিতে হয়। ভিড়ের কারণে না পারলে চুমুর ইশারা করলেও চলে। এটিও নিয়ম। ফ্রেমের মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে পাথরে চুমু দিতে হয়। মুখ না ঢোকালে চুমু দেওয়া সম্ভব নয়। আর মুখ ঢোকাতে গিয়ে সৃষ্টি হয় প্রচণ্ড ভিড়। ধর্মপ্রাণ মুসলমান ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। হাজরে আসওয়াদের পাশে সৌদি পুলিশ দাঁড়ানো থাকে ২৪ ঘণ্টা। মাথা ঢোকাতে বা চুমু দিতে গিয়ে কেউ যেন কষ্ট না পান, তা তাঁরা খেয়াল রাখেন। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও চুমু দেওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইন ধরে অপেক্ষা করেন।

মাকামে ইব্রাহিম: কাবা শরিফের পাশেই আছে ক্রিস্টালের একটা বাক্স, চারদিকে লোহার বেষ্টনী। ভেতরে বর্গাকৃতির একটি পাথর। পাথরটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা সমান-প্রায় এক হাত। এই পাথরটিই মাকামে ইব্রাহিম। মাকাম শব্দের একটি অর্থ হচ্ছে দাঁড়ানোর স্থান। অর্থাৎ হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর দাঁড়ানোর স্থান। এই পাথরে দাঁড়িয়ে তিনি ঠিক কী কাজ করতেন, তা নিয়ে মতভেদ আছে। তবে তিনি এর ওপর দাঁড়িয়ে কাবা শরিফ নির্মাণ করেছেন-এটি সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মু’জিজার কারণে শক্ত পাথরটি ভিজে তাতে তাঁর পায়ের দাগ বসে যায়। আজও আছে সেই ছাপ। তামা ও আয়নার তৈরি বাক্সে রাখার আগ পর্যন্ত মানুষ পাথরটি হাতে ধরে দেখার সুযোগ পেয়েছে। এখন শুধু দেখা যায়, ধরা যায় না। মানুষের হাতের স্পর্শে ও জমজমের পানি দিয়ে ধোয়ায় পাথরটির ভেতরে কিছুটা ডিম্বাকৃতির গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। চার হাজার বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পর মাকামে ইব্রাহিমে এখনো পায়ের চিহ্ন অপরিবর্তিত রয়েছে এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা বিশ্বাস করে, কিয়ামত পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে। ওপরে প্রতিটি ছাপের দৈর্ঘ্য ২৭ সেন্টিমিটার, প্রস্থ ১৪ সেন্টিমিটার। পাথরের নিচের অংশে রুপাসহ প্রতিটি পায়ের দৈর্ঘ্য ২২ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ ১১ সেন্টিমিটার। দুই পায়ের মধ্যে ব্যবধান প্রায় এক সেন্টিমিটার। পাথরটিতে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পায়ের দাগের গভীরতা পাথরটির উচ্চতার অর্ধেক, ৯ সেন্টিমিটার। দীর্ঘদিন ধরে লাখ লাখ মানুষের হাতের স্পর্শে আঙুলের চিহ্নগুলো মুছে গেছে। তবে ভালো করে খেয়াল করলে এখনো আঙুলের ছাপ বোঝা যায়। বোঝা যায় পায়ের গোড়ালির চিহ্ন। মাকামে ইব্রাহিমের কাছে বাঁ ঘেঁষে অনেক মুসল্লি নামাজ পড়েন, অনবরত চলে তাওয়াফ।

কাবার গিলাফ : আরবরা কাবাকে আবৃত করে রাখা কাপড়টিকে বলে কিসওয়া। আর আমরা বলি গিলাফ। হজের কয়েক দিন আগে থেকেই কাবা শরিফের গিলাফের নিচু অংশ ওপরের দিকে তুলে দেওয়া হয়। এতে কাবা শরিফের দেয়ালের বাইরের অংশ দেখা ও ধরা যায়। কাবা শরিফের দরজা ও বাইরের গিলাফ দুটোই মজবুত রেশমি কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়। গিলাফের মোট পাঁচটি টুকরো বানানো হয়। চারটি টুকরো চারদিকে এবং পঞ্চম টুকরোটি দরজায় লাগানো হয়। টুকরোগুলো পরস্পর সেলাইযুক্ত। প্রতিবছর ৯ জিলহজ কাবা শরিফের গায়ে পরানো হয় এই নতুন গিলাফ। সেই দিন হজের দিন। হাজিরা আরাফাত থেকে ফিরে এসে কাবা শরিফের গায়ে নতুন গিলাফ দেখতে পান। নতুন গিলাফ পরানোর সময় পুরোনো গিলাফটি সরিয়ে ফেলা হয়। প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন রেশম দিয়ে তৈরি করা হয় কাবার গিলাফ। রেশমকে রং দিয়ে কালো করা হয়। পরে গিলাফে বিভিন্ন দোয়ার নকশা আঁকা হয়। গিলাফের উচ্চতা ১৪ মিটার। ওপরের তৃতীয়াংশে ৯৫ সেন্টিমিটার চওড়া বন্ধনীতে কোরআনের আয়াত লেখা। বন্ধনীতে ইসলামি কারুকাজ করা একটি ফ্রেম থাকে। বন্ধনীটি সোনার প্রলেপ দেওয়া রুপালি তারের মাধ্যমে এমব্রয়ডারি করা। এই বন্ধনীটা কাবা শরিফের চারদিকে পরিবেষ্টিত। ৪৭ মিটার লম্বা বন্ধনীটি ১৬টি টুকরায় বিভক্ত। বন্ধনীটির নিচে প্রতি কোনায় সূরা আল-ইখলাস লেখা। নিচে পৃথক পৃথক ফ্রেমে লেখা হয় পবিত্র কোরআনের ৬টি আয়াত। এতে এমব্রয়ডারি করে ওপরে সোনা ও রুপার চিকন তার লাগানো হয়।

কাবাঘর: কাবাঘর প্রায় বর্গাকৃতির। এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে আনুমানিক ৪৫ ও ৪০ ফুট। কাবা শরিফের দরজা একটি এবং দরজাটি কাবাঘরের পূর্ব দিকে অবস্থিত।

মিযাবে রহমত: বায়তুল্লাহর উত্তর দিকের ছাদে (হাতিমের মাঝ বরাবর) যে নালা বসানো আছে, তাকে ‘মিযাবে রহমত’ বলা হয়। এই নালা দিয়ে ছাদের বৃষ্টির পানি পড়ে।

হাতিম: কাবাঘরের উত্তর দিকে অর্ধবৃত্তাকার উঁচু প্রাচীরে ঘেরা একটি স্থান।

জমজম কূপ: দুনিয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের যত অনুপম নিদর্শন আছে, এর মধ্যে মক্কা শরিফে অবস্থিত ‘জমজম কূপ’ অন্যতম। জমজম কূপের ইতিহাস কমবেশি সবারই জানা। এ কূপের পানি সর্বাধিক স্বচ্ছ, উৎকৃষ্ট, পবিত্র ও বরকতময়। এ পানি শুধু পিপাসাই মেটায় না; এতে ক্ষুধাও নিবৃত্ত হয়। এ সম্পর্কে হজরত মুহাম্মদ (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘এ পানি শুধু পানীয় নয়; বরং খাদ্যের অংশ এবং এতে পুষ্টি রয়েছে।’

জান্নাতুল মুআল্লা: মসজিদুল হারামের পূর্ব দিকে মক্কা শরিফের বিখ্যাত কবরস্থান।

জাবাল-ই-নূর বা গারে হেরা: মক্কার সর্বাধিক উঁচু পাহাড়। এখানে হজরত মুহাম্মদ (সা.) ধ্যানমগ্ন থাকতেন। এখানে ধ্যানমগ্ন থাকা অবস্থায় সর্ব প্রথম ওহি নাজিল হয়।

জাবাল-ই-সাওর বা গারে সাওর: মসজিদুল হারামের পশ্চিমে হিজরতের সময় এই প্রকাণ্ড সুউচ্চ পাহাড়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.) তিন দিন অবস্থান করেছিলেন।

জাবাল-ই-রহমত: আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত। এ পাহাড়ে সর্ব প্রথম নবী হজরত আদম (আ.)-এর দোয়া কবুল হয়। এখানে তিনি বিবি হাওয়া (আ.)-এর সাক্ষাৎ পান। ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের খুতবাও এখান থেকে দিয়েছিলেন।

মক্কায় যা দেখবেন

মসজিদুল হারাম (কাবা শরিফ)।
সাফা ও মারওয়া।
মক্কা লাইব্রেরি।
মক্কা জাদুঘর (মক্কা-মদিনার দুই হারাম শরিফে ব্যবহৃত জাদুঘর)
কাবার গিলাফ তৈরির কারখানা
আল-খায়েফ মসজিদ (মিনা)
হজ পালন করতে মক্কায় কাবা শরিফ ছাড়াও, মিনা, মুজদালিফা, আরাফাতের ময়দান, নামিরাহ মসজিদ প্রভৃতি ঐতিহাসিক স্থানে ঘুরে আসা যায়।

মসজিদে নববীর কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থান

রওজায়ে জান্নাত বা রিয়াজুল জান্নাহ: হুজরায়ে মোবারক ও মিম্বার শরিফের পাশের জায়গাটি ‘রওজায়ে জান্নাত’ বা ‘রিয়াজুল জান্নাহ’ বা ‘বেহেশতের বাগান’ নামে পরিচিত। এ স্থানটির বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এখানে নামাজ পড়ারও বিশেষ ফজিলত আছে। পুরো মসজিদের কার্পেটের রং লাল। তবে রিয়াজুল জান্নাহর অংশের কার্পেটের রং সাদা।

মসজিদে নববীর ভেতরে কয়েকটি স্তম্ভ রয়েছে, সেগুলোকে রহমতের স্তম্ভ বা খুঁটি বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তৈরি মসজিদে খেজুর গাছের খুঁটিগুলোর স্থলে উসমানী সুলতান আবদুল মাজিদ পাকা স্তম্ভ নির্মাণ করেন। এগুলোর গায়ে মর্মর পাথর বসানো এবং স্বর্ণের কারুকাজ করা । প্রথম কাতারে ৪টি স্তম্ভের লাল পাথরের এবং পার্থক্য করার সুবিধার জন্য সেগুলোর গায়ে নাম লেখা রয়েছে।

উস্ত্তওয়ানা হান্নানা (সুবাস স্তম্ভ): মিম্বারে নববীর ডান পাশে খেজুরগাছের গুঁড়ির স্থানে নির্মিত স্তম্ভের নাম উস্ত্তওয়ানা হান্নানা বা সুবাস স্তম্ভ। নবী করিম (সা.) মিম্বার স্থানান্তরের সময় এ গুঁড়িটি উঁচু স্বরে কেঁদে উঠেছিল।

উস্ত্তওয়ানা সারির: এখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইতিকাফ করতেন এবং রাতে আরামের জন্য তাঁর বিছানা এখানে স্থাপন করা হতো। স্তম্ভটি হুজরা শরিফের পশ্চিম পাশে জালি মোবারকের সঙ্গে রয়েছে।

উস্ত্তওয়ানা উফুদ: বাইরে থেকে আগত প্রতিনিধিদল এখানে বসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে ইসলাম গ্রহণ করতেন এবং এখানে বসেই কথা বলতেন। এ স্তম্ভটিও জালি মোবারকের সঙ্গে রয়েছে।

উস্ত্তওয়ানা আয়েশা (আয়েশা স্তম্ভ): নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আমার মসজিদে এমন একটি জায়গা রয়েছে, লোকজন যদি সেখানে নামাজ পড়ার ফজিলত জানত, তাহলে সেখানে স্থান পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করত।’ স্থানটি চিহ্নিত করার জন্য সাহাবায়ে কিরাম চেষ্টা করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হজরত আয়েশা (রা.) তাঁর ভাগ্নে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.)-কে সে জায়গাটি চিনিয়ে দেন। এটিই সেই স্তম্ভ। এই স্তম্ভটি উস্ত্তওয়ানা উফুদের পশ্চিম পাশে রওজায়ে জান্নাতের ভেতর।

উস্ত্তওয়ানা আবু লুবাবা (তওবা স্তম্ভ): একটি ভুল করার পর হজরত আবু লুবাবা (রা.) নিজেকে এই স্তম্ভের সঙ্গে বেঁধে বলেছিলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত হুজুরে পাক (সা.) নিজে না খুলে দেবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এর সঙ্গে বাঁধা থাকব।’ নবী করিম (সা.) বলেছিলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে আল্লাহ আদেশ না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত খুলব না।’ এভাবে দীর্ঘ ৫০ দিন পর হজরত আবু লুবাবা (রা.)-এর তওবা কবুল হয়। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে তাঁর বাঁধন খুলে দিলেন। এটি উস্ত্তওয়ানা উফুদের পশ্চিম পাশে রওজায়ে জান্নাতের ভেতর অবস্থিত।

উস্ত্তওয়ানা জিবরাইল: ফেরেশতা হজরত জিবরাইল (আ.) যখনই হজরত দেহইয়া কাল্বী (রা.)-এর আকৃতি ধারণ করে ওহি নিয়ে আসতেন, তখন অধিকাংশ সময় তাঁকে এখানেই উপবিষ্ট দেখা যেত।

মিহরাবে নববী: মাকরুহ ওয়াক্ত না হলে কাউকে কষ্ট না দিয়ে এখানে নফল নামাজ পড়ুন। মিহরাবের ডানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাঁড়ানোর জায়গা।

জান্নাতুল বাকি: মসজিদে নববীর পাশেই ‘জান্নাতুল বাকি’ গোরস্থান। এখানে হজরত ফাতেমা (রা.), হজরত ওসমান (রা.) সহ অগণিত সাহাবায়ে কিরামের কবর রয়েছে। এর একপাশে নতুন নতুন কবর হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এখানে শুধু একটি পাথরের খণ্ড দিয়ে চিহ্নিত করা আছে একেকটি কবর।

মদিনার কয়েকটি ঐতিহাসিক মসজিদ

কিবলাতাঈন মসজিদ: এ মসজিদে একই নামাজ দুই কিবলামুখী হয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। নামাজ পড়তে দাঁড়িয়ে ওহি পাওয়ার পর নবী (সা.) ‘মসজিদ আল-আকসা’ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নামাজের মাঝখানে মক্কামুখী হয়ে পরবর্তী অংশ সম্পন্ন করেছিলেন। এ জন্য এ মসজিদের নামকরণ করা হয় কিবলাতাঈন (দুই কিবলা মসজিদ)। মসজিদের ভেতরে মূল পুরোনো মসজিদের অংশ অক্ষত রেখে চারদিকে দালান করে মসজিদ বর্ধিত করা হয়েছে।

মসজিদে কুবা: হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় আগমন করে প্রথম শহরের প্রবেশদ্বারে কুবা নামক স্থানে নামাজ পড়েন। পরে এখানে মসজিদ গড়ে ওঠে। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, ঘর থেকে অজু করে মসজিদে কুবায় গিয়ে নামাজ পড়লে একটি ওমরাহর সমান সওয়াব পাওয়া যায়।

ওহুদ: ইসলামের ইতিহাসে দ্বিতীয় যুদ্ধ এটি। দুই মাথাওয়ালা একটি পাহাড়, দুই মাথার মাঝখানে একটু নিচু-এটাই ওহুদের পাহাড়। তৃতীয় হিজরির শাওয়াল মাসে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

মসজিদে মিকাত: মদিনা থেকে মক্কা যাওয়ার পথে মসজিদে নববী থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে এ মসজিদটি অবস্থিত। মদিনাবাসীর মিকাত বলে এ মসজিদটি মসজিদে মিকাত নামে পরিচিত।

মসজিদে জুমু’আ: রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরতের সময় কুবার অদূরে রানুনা উপত্যকায় ১০০ জন সাহাবাকে নিয়ে মসজিদে জুমু’আর স্থানে প্রথম জুমু’আর সালাত আদায় করেন।

মসজিদে গামামাহ: এ মসজিদকে মোসাল্লাহও বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথম ঈদের সালাত ও শেষ জীবনের ঈদের সালাতগুলো মসজিদে গামামাহয় আদায় করেন। এখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) বৃষ্টির জন্য নামাজ পড়েছেন বলে একে মসজিদে গামামাহ বলা হয়। এটি মসজিদে নববীর দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত।

মসজিদে আবু বকর (রা.): এটি মসজিদে গামামাহর উত্তরে অবস্থিত। হজরত আবু বকর (রা.) খলিফা থাকাকালে এ মসজিদে ঈদের সালাত পড়াতেন। তাই এটি মসজিদে আবু বকর (রা.) হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

মসজিদে কুবা, মসজিদে কিবলাতাঈন, ওহুদ পাহাড়, খন্দকের পাহাড় প্রভৃতি দেখার জন্য মসজিদে নববীর বাইরে প্রবেশপথের কাছে ট্যাক্সিচালকেরা প্যাকেজের ব্যবস্থা করে থাকেন। খরচ মাত্র ১০ রিয়াল।

সময় পেলে দেখতে পারেন মসজিদে নববীর উত্তর দিকের গেট দিয়ে বেরিয়েই সাহাবাদের মসজিদ, মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়, বাদশাহ ফাহাদ কোরআন শরিফ ছাপাখানা প্রকল্প।